Home » সামাজিক গল্প » Moral Story অস্তিত্ব Astitya – [সামাজিক গল্প]

Moral Story অস্তিত্ব Astitya – [সামাজিক গল্প]

Moral Story – মামার বাড়ি যাবার পর মামা আমাকে একটি যন্ত্র দেয় যার সাহায্যে বিভিন্ন জীবজন্তুর কথা মানুষের ভাসায় শোনা যায়।  সেই যন্ত্রটি ব্যবহার করার ফলে মনুষ্যত্ব সম্পর্কে আমার নতুন ধারণা জন্মায়। শেষ পর্যন্ত কি ঘটল জানার জন্য গল্পটি পড়ুন।

Moral Story – অস্তিত্ব

আমার ছোট মামা বন দফতরের একজন কর্মচারী। তার বর্তমান পোস্টিং সুন্দরবন এ।  অনেকদিন ধরে মামা সেখানে যাওয়ার জন্য বলছিল। যতবার প্ল্যান করেছি যাওয়ার জন্য ততবার প্ল্যানটা মাটি হয়ে গেছে কোন না কোন কাজের জন্য। তাই ভাবলাম এবার যেতেই হবে। ঠিক করলাম কালই রওনা দেব।

 

   টানা ছয় ঘন্টা যাত্রা করে মামার বাসায় যখন পৌছালাম তখন দুপুর। আমাকে দেখে মামা বেশ খুশি হলো। এরপর বাড়ির সবার খোঁজ খবর নিয়ে মামা বলল, “অনেক জার্নি করে এসেছিস, স্নান খাওয়া করে একটু চাঙ্গা হয়ে নে। বিকেলে তোকে বন দেখাতে নিয়ে যাবো।”

 

   স্নান খাওয়ার পর আমি আর মামা বিছানায় বসে কথা বলছি। সুন্দরবন এ কি কি গাছ ও জীবজন্তু দেখা যায় সেগুলো আমাকে গল্প করে শোনাচ্ছে। বিছানার পাশের টেবিলে একটা যন্ত্র দেখে মামাকে জিজ্ঞেস করলাম, “এটা কি মামা?”

 

   ” এটা একটা গান শোনার আইপড। জাপান থেকে আমার এক বন্ধু পাঠিয়েছে। গান শোনা ছাড়া এই যন্ত্র টার আরও একটা বিশেষ দিক আছে। হেডফোন লাগানোর খাঁজের পাশে যে সবুজ সুইচটা আছে সেটাতে চাপ দিলে যেকোনো জীবজন্তুর কথা মানুষের ভাষায় শোনা যায়।”, বলল মামা।

 

Bangla Golpo

    এ ব্যাপারটা আমার বেশ ভালো লাগলো। এরপর আমাদের ভ্রমণের ব্যবস্থা করার জন্য মামা তার অফিসে গেল।
   ঘরের মধ্যে দুটো মশা উড়ছে।

 

    প্রথম মশা– বাসায় নতুন শিকার এসেছে ভাই (আমাকে দেখে)।

 

    দ্বিতীয় মশা– তাহলে আবার দেরি কেন। শুরু হোক রক্তচোষা।

 

     এই বলে দ্বিতীয় মশা টি উড়তে উড়তে আমার দিকে আসা শুরু করলো। মাথার চারপাশে চক্কর দিয়ে আমার গালে বসল। যেইনা মশাটা আমার গালে হুল ফুটিয়েছে অমনি গালে একটা চাঁটি দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে মশাটা মাটিতে পড়ে গেল।

 

    এমন সময় আমি শুনতে পেলাম প্রথম মশা টা বলছে, “ওরে বাবা, কি সাংঘাতিক। না পালালে এবার হয়তো আমাকে মারবে।”
 
    এই কথা বলে মশাটা জানালা দিয়ে পালিয়ে গেল।

Bangla Golpo

   একটু পরেই শুনলাম মামা ডাকছে, “চল এবার বেড়াতে যাব।”

 

   বাইরে এসে দেখি দুটো হাতি 🐘 দাঁড়িয়ে আছে।

 

   “আমরা কি হাতি চড়ে বন দেখবো মামা।”

 

   “হ্যাঁ, তোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করলাম ভাগ্নে”

 

   আমি আর মামা একটা হাতির পিঠে চড়লাম আর অন্যটায় চড়ল মামার অফিসের দুই বন্ধু। শুরু হল বনভ্রমন।
 
 
Moral Story
সামাজিক গল্প
চারিদিকে কত সব জীবজন্তু – হরিণ, বুনো মোষ, বানর, ভাল্লুক, বাঘ – আরও কত কি। কিন্তু এসবের মাঝে একটা ব্যাপার বেশ লক্ষণীয়। আর সেটা হল সব জীবজন্তু আমাদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করছে। মনে হচ্ছিল তারা যেন আমাদেরকে কিছু বলতে চাইছে। খুব আফসোস হচ্ছিল আইপড টা সঙ্গে না নিয়ে আসার জন্য। তাহলে জানা যেত তারা ঠিক কি বলছে।

 

   খুব অল্পের জন্য আমি একটা দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেলাম। অন্যান্য জন্তুগুলোর চিৎকার শুনে হঠাৎ হাতিটা লাফালাফি শুরু করে দিল। আমি প্রায় পড়ে যাচ্ছিলাম। ভাগ্যিস মামা আমাকে সেই সময় ধরে নিয়েছিল। সারা বিকেল আমরা বন দেখে বেড়ালাম এবং ফিরলাম সন্ধ্যাবেলায়।
 
Moral Story
 
    রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পর জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। মামা দিব্যি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। তাই আমি আইপড টা নিয়ে কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শোনা শুরু করলাম। এমন সময় ঘটল এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। সেই কোথায় আজ বলব। বাড়ির এর পিছনে কিছু জন্তু-জানোয়ারের চিৎকার করছে। মনে হচ্ছে তারা যেন কোন বিষয়ে গভীর আলোচনা করছে। ঠিক কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তাই কৌতুহল নিবারণের জন্য সবুজ সুইচটা অন করলাম।

 

   একটা হরিণ বাঘের দিকে ইশারা করে বলছে, “পশুরাজ রক্ষা কর।”
 
   পশুরাজ বলল, “কেন কি হয়েছে?”
 
   হরিণ বলল, “এখন তোমার থেকে চোরা শিকারিদের বেশি ভয় করে। তুমিতো হপ্তায় দুই একবার শিকারে বের হও। কিন্তু এই শিকারীরা কখন কোন গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে, কখন যে গুলি করে বসে কিছু বলা যায় না। দুদিন ধরে আমার বন্ধুকে খুঁজে পাচ্ছি না। আমার মনে হয় ওই শিকারিদের দল তাকে নিয়ে গেছে। এখন তো সব সময় একটা অজানা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটে।”
  
    হরিণের কথা শুনে পশুরাজ বাঘ বলল, “ভয়তো আমারো করে বাছা। মানুষ মনে করে বাঘ শিকার নাকি পুরুষত্বের কাজ। তারা লুকিয়ে লুকিয়ে গাছের আড়াল থেকে আমাদের গুলি করে মারে। এটাই কি তাদের পুরুষত্ব?

 

Moral Story Bangla

    এমন সময় গাছ থেকে একটা বানর নিচে লাফ দিয়ে বলল, “বনে ঘুরে ঘুরে বিরক্ত লাগছিল, তাই ভাবলাম যাই একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। ঘুরতে ঘুরতে একটা গ্রামে আসলাম। দেখি সেখানে একটা লোক কিছু বাঁদর নিয়ে কি সব খেলা দেখাচ্ছে। আরো অনেক লোক তাদেরকে ঘিরে দাঁড়িয়ে সেগুলো দেখছে। এত মানুষ দেখে ভয় আমি একটা গাছে চললাম – কি জানি বাবা এরা আবার লাঠি নিয়ে তেড়ে আসবেনা কে বলতে পারে। ইশারায় একটা বানর কে জিজ্ঞেস করলাম ভাই তোমরা এসব কি করছো? সেই বানরটা যা বলল তা শুনে আমি একবারেবার অবাক হয়ে গেলাম।”

 

   পশুরাজ তাকে জিজ্ঞেস করল, “কেন, সে বানরটা এমন কি বলল যা শুনে তুমি অবাক হয়ে গেলে?”

 

    পশুরাজ এর প্রশ্ন শুনে বনের বানরের উত্তর –  “সে বলল, ভাই আমরা এই লোকটার কাছে বন্দি – এই যে দেখছো গলায় চেইন বাঁধা। পালিয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই। লোকটা যা বলে আমাদেরকে তাই করতে হয়। না করলে লাঠি দিয়ে মারে। তুমিও পালাও, না হলে তোমার অবস্থা ও ঠিক আমাদের মতো হবে।”

 

    বনের বানর টা আবার বলল, “আমার তাদেরকে সাহায্য করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আমি একা। কি বা করব। তাই আমি ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেলাম।”

 

Moral Story

    এরপর পশুরাজ বলল, “তারপর কি করলে?”

 

    “এরপর ঘুরতে ঘুরতে আমি একটা শহরে গেলাম। ভাবলাম শহরের মানুষ সভ্য। এখানে ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু সেখানেও আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হল।” বানর টা প্রতুত্তর করল।

 

    পাশ থেকে একটা ভাল্লুক বলে উঠলো, “কেনরে হতচ্ছাড়া, সেখানে আবার কি দেখলি?”

 

    বানর – সেখানে যা দেখলাম তা দেখে আমার তো মাথা ঘুরে গেল। একটা জায়গা যার নাম চিড়িয়াখানা সেখানে খাঁচার মধ্যে বিভিন্ন জীব যেমন বাঘ, ভাল্লুক, শিম্পাঞ্জি, জিরাফ, জেব্রা, বিভিন্ন পাখি আরো কত কি – এদেরকে বন্দি করে রেখেছে। আবার এক জায়গায় দেখলাম নাম না জানা বিভিন্ন মাছ, কচ্ছপ এদেরকে কাঁচের খাঁচার মধ্যে রেখেছে। এসব আবার বিভিন্ন মানুষ আনন্দ সহকারে দেখছে।

 

  
    পশুরাজ বাঘ – তারপর কোথায় গিয়েছিলে?

 

Moral Story

    বানর – এরপর ঘুরতে ঘুরতে গেলাম সার্কাস নামক একটি জায়গায়। সেখানে দেখি একটা লোক হাতে চাবুক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর তার নির্দেশ মতো  সিংহ, হাতি, বাঘ ও অন্যান্য বিভিন্ন জন্তু বিভিন্ন কাজ করছে। আর সেগুলো দেখে মানুষের দল হাততালি দিচ্ছে।

 

    পশুরাজ বাঘ রেগে গিয়ে বানরটাকে বলল, “কি যা তা বলছ, একটা বাঘ মানুষের কথা মত কাজ করছে।”

 

    “না করে যে উপাই নেই রাজামশাই। কারন মানুষটার হাতে যে চাবুকটা আছে সেটা দিয়ে মরলে প্রচন্ড শক লাগে। আর সেই ভয়েই তারা ঐসব কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।”, বলল বানর

 

    পশুরাজ – এত কিছু তো আমার জানা ছিল না। এরা তো দেখছি আমাদের সং সাজিয়ে রেখে দিয়েছে।

 

    একটা সাপ অনেকক্ষণ ধরে এসব কথা শুনছিল। সে বলল, “তবুও ঢের ভাল। মানুষের দল তো আপনাদের কে জ্যান্ত রেখে নিজেদের মনোরঞ্জন করে। কিন্তু আমাদের অবস্থা তো আরও শোচনীয়। এরা আমাদের মেরে তার চামড়া থেকে বানাচ্ছে জুতো, কোমরের বেল্ট, ম্যানিব্যাগ আরও কত কি। আমার তো এখন বন থেকে বেরোতেই ভয় করে।”

 

    ভাল্লুক কে উদ্দেশ্য করে পশুরাজ বলল, “সবার কথাই তো শুনলাম। তুমি বা বাদ যাবে কেন। তোমার কিছু বলার নেই।

 

    ভাল্লুক বলল, “সব থেকে দুঃখের বিষয় কি জান, এদের এক সম্প্রদায় নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য আমাদের অস্তিত্ব মেটাতে তৎপর। তারা আমাদের নতুন নামকরণ করেছে – বিলুপ্ত প্রাণীবিলুপ্তপ্রায় প্রাণী। এরা দুই হাতে বন জঙ্গল কেটে আমাদের থাকার জায়গার অভাব ঘটাচ্ছে। সারা পৃথিবী তাদের হাতে, তবুও  জায়গার অভাব। এদের চাওয়া পাওয়ার কোন সীমা নেই। তবে হ্যাঁ, সবাই এক গোত্রে পড়ে না। কিছু কিছু মানুষ আছে যারা আমাদের জন্য লড়াই করছে। দেশে নতুন নতুন আইন বানানো হচ্ছে। এর জন্যই হয়তো আমরা এখনো বেঁচে আছি। এই মানুষগুলো যেদিন থাকবে না সেদিন আমাদের অস্তিত্ব নিশ্চিত রূপে সংকট পূর্ণ হবে।

 

    এতক্ষণ আমি বুঝতে পারলাম বিকেলে কেন এরা আমাদের চেয়ে চিৎকার করছিল আর কেনই বা হাতিটা লাফাচ্ছিল।

 

    সব কথা শুনে সেখানে উপস্থিত সমস্ত পশুর মুখ থমথমে হয়ে গেল। সঙ্গে আমারও।

 

    পশুরাজ বাঘ এমন সময় গর্জন করে বলল, ” এর প্রতিবাদ করতেই হবে। এরকম চলতে থাকলে আমাদের অস্তিত্ব আর বেশিদিন টিকে থাকবে না। আমাদের অবিলম্বে মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা উচিত।”

 

    পশুদের সভার সমস্ত কথা একটা শেয়াল আড়াল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে শুনছিল। শেয়ালটা এবার সবার সামনে এসে বলল, “থামুন মহারাজ। আপনি যে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা কথা বলছেন সে শত্রু আমাদের থেকেও হাজারগুণ বেশি শক্তিশালী। তারা এখন নিত্যনতুন অস্ত্রে বলীয়ান। তাদের সব থেকে আধুনিক দুটি অস্ত্র হলো পারমানবিক বোমা ও হাইড্রোজেন বোমা। এরকম একটা বোমা এই জঙ্গলে পড়লে সবার মৃত্যু নিশ্চিত, সবকিছু জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।”

 

    শিয়ালের কথা শুনে মনের সমস্ত জন্তু ভয়ে গুম হয়ে বসে থাকলো।

 

    পশুরাজ শেয়াল কে বলল, “তাহলে তুমি বলো আমরা কি করব?”

 

    প্রত্যুত্তরে শেয়াল বলল, ” আজকের আলোচনা এখানেই স্থগিত রাখুন। আরেকদিন সবাইকে ডাকুন। তখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে কি করা উচিত।”

 

    এরপর সব জীবজন্তু একে একে গভীর জঙ্গলে মিলিয়ে গেল।

 

 

    আমি এতক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে এসব কান্ড কারখানা দেখছিলাম আর শুনছিলাম। মনে মনে ভাবলাম মনুষ্যজাতি কি সত্যিই উন্নত হচ্ছে না আবার সেই আদিম শিকারি হয়ে যাচ্ছে? আমাদের তো কোন কিছু অভাব নেই। তাহলে আমরা কোন অধিকারে এদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করছি। হয়তো একদিন এমন সময় আসবে যখন মানুষের পাশবিকতার জন্য এদের অস্তিত্ব সমূলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে কিংবা এমন হতে পারে নিজেদের অস্তিত্বের তাগিদে মানুষের সঙ্গে সম্মুখ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে। এইরকম সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে আমি একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।

 

    এরপর আরও এক সপ্তাহ মামার বাসায় ছিলাম। সেই এক সপ্তাহে কি ঘটল অন্য কোন দিন বলব। কিন্তু ফেরার সময় মামাকে একটাই কথা বলে এলাম যে যত তাড়াতাড়ি পারো সুন্দরবন থেকে ট্রান্সফার হয়ে যাও।

 

    মামা জানতে চেয়েছিল আমি এরকম কথা বলছি কেন। আমি এর কোন উত্তর দিতে পারিনি।  কিন্তু আপনারা হয়তো উত্তরটা দিতে পারবেন।
    
ধন্যবাদ।
অমিত মন্ডল।

আরও পড়ুন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১২০ টি বিখ্যাত উক্তি

Leave a Comment